যুক্তরাজ্যে অভিবাসন নীতি আরও কঠোর করার পর ভিসার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে দেশটির অন্তত ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের ভর্তির আবেদনের ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের সরকার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে নিয়মকানুনে যে কঠোরতা এনেছে, তারই ধারাবাহিকতায় এসেছে এই সিদ্ধান্ত। নতুন নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে শিক্ষার্থীরা আসলেই পড়ার জন্য সে দেশে যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থী ভিসাকে চোরাপথ হিসেবে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করছে না। ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার, ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন, ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন, কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্ববিদ্যালয় আছে এই তালিকায়। যেসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভর্তিতে এই পরিবর্তন এনেছে, সেগুলোর মধ্যে ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার আগামী বছরের শরৎকাল (অটাম) পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে সব ধরনের শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করেছে। কারণ হিসেবে সম্প্রতি অপ্রত্যাশিতভাবে ভিসা আবেদন নাকচের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছে তারা। ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে স্নাতকের শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ করছে না।
হঠাৎ কেন এই নিষেধাজ্ঞাযুক্তরাজ্যের হোম অফিসের জারি করা নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকতে হবে–যা আগে ছিল ১০ শতাংশ। ভর্তির অনুমতি পাওয়া শিক্ষার্থীদের শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার নিয়মেও কঠোরতা এনেছে ইউকে হোম অফিস। অর্থাৎ, ভর্তির আবেদন গৃহীত হওয়া শিক্ষার্থী আসলেই ভর্তি হলো কিনা, কোর্স শেষ করল কি না, এসব নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এসব নিয়ম না মানতে পারলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নেয়ার লাইসেন্সও হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার হার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক ওপরে–২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ২২ শতাংশ, পাকিস্তানের ১৮ শতাংশ। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, গত এক বছরে বিশ্বজুড়ে যে ২৩ হাজার ৩৬ জন শিক্ষার্থীর ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে ইউকে হোম অফিস, তার অর্ধেকই এই দুই দেশের। ফলত পরিস্থিতি বিবেচনায় এই দুই দেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে রাজি নয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যে কারণে দুই দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তির আবেদনই সাময়িকভাবে স্থগিত করে রাখছে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। লাহোরভিত্তিক শিক্ষা পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান এডভ্যান্স অ্যাডভাইজর্সের প্রতিষ্ঠাতা মারইয়াম আব্বাস বলেন, প্রকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য এসব সিদ্ধান্ত ‘হৃদয়বিদারক’। কারণ, আবেদন প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে এসে তাদের ভিসা আবেদন প্রত্যাহার হওয়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এমন প্রণোদনা তৈরি করেছে যার ফলে ভুয়া আবেদন বাড়ছে। পাশাপাশি, বিদেশি শিক্ষার্থী সংগ্রহের জন্য যেসব এজেন্সিকে তারা ব্যবহার করে, সেগুলোর ওপর আরও কঠোর নজরদারির আহ্বান জানান তিনি।
মারইয়াম আব্বাস আরও বলেন, ‘পাকিস্তানে শত শত এজেন্সি আছে যারা সত্যি বলতে শিক্ষর্থীরা কোথায় যাচ্ছে তা নিয়ে খুব বেশি ভাবে না।’ তার মতে, এই খাতটি এখন ‘অর্থ আয় করার ব্যবসা’তে পরিণত হয়েছে। গত মে মাসে প্রকাশিত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের ২২টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নবঘোষিত কঠোর বিসিএ মানদণ্ডের অন্তত একটি ধাপেই ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা ১৭টি প্রতিষ্ঠান মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হতে পারে এবং শিক্ষার্থী স্পনসরশিপ বজায় রাখতে পারে। তবে বাকি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অন্তত এক বছরের জন্য স্পনসরশিপের অধিকার হারাবে। এর ফলে প্রায় ১২ হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।