শীতের শুরু মানেই হালকা ঠাণ্ডা, কমে আসা আর্দ্রতা এবং বাতাসে শুকনা ভাব।

আবহাওয়া পাল্টানোর এই সময়ে শরীরের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় হাত–পায়ের ত্বক। বিশেষ করে যারা বেশি সময় বাইরে থাকেন, বারবার পানি দিয়ে কাজ করেন, ঘরের মেঝে ঠাণ্ডায় স্পর্শ পায় এমন কাজ করেন বা প্রাকৃতিকভাবে যাদের ত্বক শুষ্ক— তাদের হাতে–পায়ের চামড়া ওঠা খুবই সাধারণ সমস্যা।

অনেক সময় এই শুষ্কতা এতটাই বেড়ে যায় যে সাদা সাদা খোসা উঠতে থাকে, চামড়া ফেটে ব্যথা করে এবং দৈনন্দিন কাজে অস্বস্তি হয়।

তবে শীত এলেই এই সমস্যা হবে, এটা কিন্তু সত্য নয়।

একটু সচেতনতা, সঠিক যত্ন এবং নিয়মিত পরিচর্যা থাকলে শীতের পুরো মৌসুমেই হাত–পায়ের ত্বক নরম ও আর্দ্র রাখা সম্ভব।

কেন শীতে বেশি চামড়া ওঠে?

শীতের শুষ্ক বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়। পাশাপাশি ত্বক থেকেও আর্দ্রতা দ্রুত বাষ্পীভূত হয়।

রূপবিশেষজ্ঞ শারমিন কচি বলেন, “হাত–পায়ে সারাদিনে অসংখ্যবার পানি, সাবান, মাটি, ধুলা এবং ঠাণ্ডা বাতাসের সংস্পর্শে আসে। ফলে শীতের শুরুতেই হাত ও পায়ের ওপরের স্তরের ত্বক ফেটে যেতে থাকে এবং খোসা ওঠে।

এর পাশাপাশি কিছু কারণ সমস্যা আরও বাড়িয়ে তোলে। যেমন—

বারবার সাবান ব্যবহার, গরম পানিতে হাত–পা ধোয়া, হাত ধোয়ার পর ময়েশ্চারাইজার না লাগানো, ত্বক স্বভাবতই শুকনা হওয়া, একজিমা বা অ্যালার্জির সমস্যা থাকা ইত্যাদি।

শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

ত্বকের ধরন বুঝে শুরু শীতের পরিচর্যা

কারও ত্বক খুব শুষ্ক, কারও স্বাভাবিক, আবার কারও মিশ্র। যাদের শুষ্ক ত্বক, তাদের ক্ষেত্রে হাত–পায়ের চামড়া ওঠার সমস্যা বেশি হয়।

তাই শীত শুরু হওয়ার আগেই ত্বকের ধরন অনুযায়ী যত্ন নেওয়ার পরমার্শ দেন, শারমিন কচি।

স্বাভাবিক ত্বকের জন্য হালকা ক্রিম বা লোশন যথেষ্ট হলেও অতিশুষ্ক ত্বকে প্রয়োজন হয় ঘন টেক্সচারের ময়েশ্চারাইজার, বডি বাটার বা পেট্রোলিয়াম জেলি।

যারা একজিমায় ভোগেন তাদের জন্য সুগন্ধিবিহীন ও অ্যালার্জি হবে না এমন পণ্য বেছে নেওয়া জরুরি।

হাত–পায়ের পরিচর্যা: নিয়মিত ময়েশ্চারাইজিং

শীতে হাত–পায়ের আর্দ্রতা ধরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার লাগানো।

শারমিন কচির পরামর্শ হল- হাত ধোয়ার পরপরই ময়েশ্চারাইজার লাগানো উচিত, কারণ পানি শুকানোর সঙ্গে সঙ্গেই ত্বক আরও শুষ্ক হয়ে যায়।

ময়েশ্চারাইজারের মধ্যে হায়ালুরনিক অ্যাসিড, গ্লিসারিন, শিয়া বাটার থাকলে সেসব আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।

হাত ও পায়ের জন্য রাতে ঘুমানোর আগে একটু ঘন টেক্সচারের ক্রিম ব্যবহার করলে সারারাত আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়।

চাইলে রাতের জন্য পেট্রোলিয়াম জেলি লাগিয়ে পাতলা সুতির মোজা পরলে আরও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।

গরম পানি নয়, কুসুম গরমই যথেষ্ট

শীতের সকালে গরম পানিতে হাত–মুখ ধোয়া আরামদায়ক লাগলেও ত্বকের জন্য তা মোটেই ভালো নয়।

“গরম পানি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট করে দেয়, ফলে ত্বক আরও বেশি শুকিয়ে যায় এবং চামড়া ওঠে”- বলেন এই বিশেষজ্ঞ।

তাই হাত–পা ধোয়ার সময় কুসুম গরম পানি ব্যবহার করাই সঠিক। এছাড়া গোসলের সময় অনেকক্ষণ ধরে গরম পানি ব্যবহারও শুষ্কতা বাড়িয়ে দেয়।

সাবান ব্যবহার কম এবং মাইল্ড ক্লিনজারে অভ্যস্ত হওয়া

অনেকেই প্রতিবার হাত ধোয়ার সময় শক্তিশালী সাবান বা অ্যান্টিসেপটিক বার ব্যবহার করেন।

এটি শীতের শুরুতেই ত্বকের আর্দ্রতা নষ্ট করে দেয়। তাই মাইল্ড, সুগন্ধিবিহীন বা স্যালফেট–ফ্রি হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহার করা উচিত।

যাদের ত্বক খুব শুষ্ক, তারা দিনে দুতিনবার ময়েশ্চারাইজার সমৃদ্ধ হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন।

পায়ে বিশেষ যত্ন: গোড়ালির ফাটাভাব প্রতিরোধ

শীত এলেই অনেকের পায়ের গোড়ালি ফেটে যায়, রক্ত বের হয় এবং ব্যথা করে। এর মূল কারণ অতিরিক্ত শুষ্কতা।

গোড়ালি সাধারণত দেহের ওজন বহন করে এবং ঘর্ষণ বেশি হয়, তাই সেখানে আর্দ্রতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।

গোড়ালির যত্নে রাতে পা ভিজিয়ে নরম করে হালকা ‘পিউমিস স্টোন’ বা ঝামা-পাথর দিয়ে মৃত কোষ ঘষে ফেললে ভালো।

এরপর ঘন ক্রিম বা ভ্যাসলিন–ধর্মী মলম লাগিয়ে সুতির মোজা পরে ঘুমালে কিছুদিনেই ফাটাভাব কমে যায়।

যদি ফাটায় চামড়া খসে ব্যথা করে, তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক ক্রিম লাগানো প্রয়োজন হতে পারে—যা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়।

খাদ্যাভ্যাসও রাখে বড় ভূমিকা

শীতের শুষ্কতা কেবল বাইরে লাগানো ক্রিম নয়, ভেতর থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। খাদ্যতালিকায় ওমেগা–থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডস সমৃদ্ধ খাবার যেমন— চিয়া সিড, তিল, বাদাম, আখরোট, সামুদ্রিক মাছ বা ডিম যোগ করলে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল বজায় থাকে।

এছাড়া প্রতিদিন প্রচুর পানি পান করতে হবে, কারণ শীতে তৃষ্ণা কম লাগে। ফলে পানি গ্রহণও কমে যায় এবং ত্বক দ্রুত শুষ্ক হয়।

ভিটামিন–ই–সমৃদ্ধ খাবার যেমন— সূর্যমুখীর বীজ, পালংশাক ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। ভিটামিন–সি ত্বকের কোলাজেন শক্ত রাখে, ফলে হাত–পায়ের চামড়া ওঠাও কমে।

ধুলাবালির যত্ন: বাইরে গেলে সুরক্ষিত

শীতের বাতাস শুষ্ক হওয়ায় ধুলাবালিও বেশি উড়তে থাকে। বাইরে গেলে হাত–পা ধুলায় নোংরা হয় এবং ত্বকের আর্দ্রতা আরও কমে যায়।

তাই বাইরে দীর্ঘসময় থাকলে হ্যান্ডগ্লাভস ব্যবহার করা ভালো।

বিশেষ করে বাইক চালান এমনদের জন্য গ্লাভস অপরিহার্য। পায়ের ক্ষেত্রে স্যান্ডেলের পরিবর্তে ঢাকা জুতো পরলে ত্বক সুরক্ষিত থাকে।

হাত–পা ঘষাঘষি নয়, কোমল যত্ন জরুরি

“অনেকে ভাবেন চামড়া উঠলে ঘষে তুলে ফেললেই ত্বক পরিষ্কার হবে। তবে এতে ত্বকের উপরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আরও বেশি খোসা ওঠে”- বলেন শারমিন কচি।

তাই পাতলা চামড়া উঠে গেলে তা নিজে নিজেই উঠতে দিন। জোরে ঘষাঘষি করলে লালচে দাগ, ব্যথা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।