দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা। আক্রান্ত হচ্ছেন তরুণ থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষ। তবে দেশে এখনো পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে স্ট্রোকে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা নিতে গিয়ে পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যমতে, বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ স্ট্রোক। প্রতি চারজনের একজনের মৃত্যু হয় এই রোগে। প্রতি মিনিটে বিশ্বে ১০ জন মানুষ স্ট্রোকে মারা যান। তাদের মধ্যে ৪৮ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগী। শিশুদের মধ্যেও স্ট্রোকের হার বেড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানায়, ২০১৯ সালে স্ট্রোকে মারা গিয়েছিলেন ৪৫ হাজার ৫০২ জন। এক বছর পর ২০২০ সালে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ৮৫ হাজার ৩৬০ জনে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, “স্ট্রোক একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সময়মতো রোগীকে চিকিৎসকের কাছে আনলে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ট্রোক প্রতিরোধ করা যায়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, তামাকজাত পণ্য সেবন, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও মানসিক চাপ স্ট্রোকের প্রধান ঝুঁকির কারণ। মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত বা ছিঁড়ে গেলে স্ট্রোক হয়। এতে প্যারালাইসিস বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

শহরের তুলনায় গ্রামে ঝুঁকি বেশি
নিউরোসার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. সুমন রানা জানান, শহরের তুলনায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখন বেশি ঝুঁকিতে। তিনি বলেন, “আমাদের দেশে প্রায় ৫৩ শতাংশ স্ট্রোক রোগী গ্রামের মানুষ। তাদের মধ্যে ৩২ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।”

নারীর তুলনায় পুরুষের ঝুঁকি দ্বিগুণ
গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর তুলনায় পুরুষদের স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ। প্রতি হাজারে ১৪ জন পুরুষ ও ৮ জন নারী এই রোগে আক্রান্ত হন।

ময়মনসিংহে রোগীর সংখ্যা সর্বাধিক
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ময়মনসিংহ বিভাগে প্রতি হাজারে ১৪ দশমিক ৭১ জন মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। সবচেয়ে কম রাজশাহী বিভাগে, প্রতি হাজারে ৭ দশমিক ৬২ জন।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন নতুন স্ট্রোক রোগী ভর্তি হচ্ছেন। বিভাগটির সাবেক প্রধান অধ্যাপক মানবেন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, “এ অঞ্চলে দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও সচেতনতার অভাবের কারণে মানুষ আগেই ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপে ভুগলেও তা বুঝতে পারেন না।”

চিকিৎসা সংকট ও ক্যাথল্যাবের ঘাটতি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বাইরে এখনো কোথাও স্ট্রোক চিকিৎসার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই। দেশের মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ক্যাথল্যাব থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। অথচ আক্রান্তের ৪০ শতাংশ রোগীরই প্রথম আট ঘণ্টার মধ্যে এই সাপোর্ট প্রয়োজন হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, “স্ট্রোকে আক্রান্তদের মধ্যে ৪৮ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপের রোগী। এর সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত চর্বি, মানসিক চাপ ও ডায়াবেটিসও বড় কারণ।”

বিশেষজ্ঞরা জানান, দ্রুত থ্রম্বোলাইসিস চিকিৎসা দেওয়া গেলে রোগীর মস্তিষ্কের ক্ষতি কমানো সম্ভব। জমাট বাঁধা রক্ত দ্রবীভূত করে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক করাই এই চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি বা মৃত্যু ঘটে যেতে পারে।

ইএফ/