সব জল্পনা-কল্পনা শেষ করে বৃহত্তর উত্তরা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৮র নির্বাচনী প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পথে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে ডিসেম্বর মাসের ৭-১০ তারিখের মাঝেই। সেই তফসিলের দিকেই তাকিয়ে আছে বৃহত্তর উত্তরার (উত্তরা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, তুরাগ আর খিলক্ষেত নিয়ে গঠিত) ঢাকা-১৮ আসনের বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী ও জনগণ।
ঢাকা-১৮ আসন মূলতঃ দলীয় ইমেজ বৃদ্ধির আসন। অতীতে যেই দলই ক্ষমতায় এসেছে তারা এই আসনে জয়লাভ করেছে। এই আসনে ১৯৯১ সালে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন করে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। সে হিসেবে এবারো উক্ত আসনে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নাম নিশ্চিত করেছে দলীয় সূত্রগুলো। তবে তারা কেউ একে অপরের বিরুদ্ধে দাড়াবেন না-এটা মোটামুটি নিশ্চিত। দুজনের যে কোন একজন ঢাকা-১৮ তে নিজের দ্বিতীয় আসন হিসেবে দাঁড়াবে-এজন্য এই আসনে বর্তমানে দু‘দলের কোন প্রার্থীই জোড় কদমে নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন নাই। এই আসনে ইতোমধ্যে যারা গণসংযোগ শুরু করেছেন, তাদের মধ্যে এগিয়ে আছেন জামায়াতের অধ্যক্ষ আশরাফুল হক, শহীদ মীর মুগ্ধের ছোট ভাই মীর স্নিগ্ধ, বিএনপির এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন, এম কফিলউদ্দিন আহমেদ এবং এনসিপির নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারি। কিন্তু উক্ত প্রার্থীদের কাউকেই দলীয় গ্রীন সিগন্যাল দেয়া হয়নি। বিএনপির অন্তর্কোন্দলের সুযোগে মাঠে শুধুমাত্র জামায়াতের প্রার্থীর কিছু গণসংযোগ চোখে পড়লেও তা নির্বাচনী প্রচারণার উল্লেখযোগ্য কর্মতৎপরতা নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষজন।
বিএনপি থেকে মীর স্নিগ্ধকে দলীয় সমর্থন দেওয়া হলেও তার নির্বাচনী আসন কোথায় হবে অথবা আদৌ বিএনপি মীর স্নিগ্ধকে নির্বাচনী প্রার্থী করবে কিনা তা নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে শহীদ জিয়ার স্মৃতিধন্য ও বেগম জিয়ার সাবেক আসন বলে এলাকার মানুষ মনে করছেন এবার তারেক জিয়া অথবা তার স্ত্রী জোবায়দা রহমান উক্ত আসনের প্রার্থী হবেন। লন্ডন থেকে ফিরে ইতোমধ্যে জোবায়দা রহমান উক্ত আসনের ভোটার হয়েছেন। বৃহত্তর উত্তরার দক্ষিণখানের আর্মি সোসাইটিতে শহীদ জিয়ার একখন্ড জমি এখনো আছে। এখানেই বেগম জিয়া এমপি ছিলেন।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত কমিটির বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে, দেশে আসার পর বগুড়ায় নির্বাচনী ক্যাম্পেইন এ একবারের বেশি তারেক জিয়ার যাওয়ার সুযোগ হবে না বিধায় উত্তরায় তিনি দ্বিতীয় আসন হিসেবে নির্বাচন করবেন। আর সেটাও সম্ভব না হলে জোবায়দা রহমান বা মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান এই আসনের প্রার্থী হবেন।
অন্যদিকে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের জন্মস্থান মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) এ দ্বিতীয় আসন হিসেবে প্রার্থী হওয়ার কথা থাকলেও উনি সেখানে প্রার্থী হবেন না এটা মোটামুটি নিশ্চিত। কুলাউড়াতে জামায়াতের জিতে আসার মতো শক্ত প্রার্থী আছে। দলীয় প্রধান হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাধিক আসনে প্রার্থীতা চূড়ান্ত করার ইতিহাস খুবই স্বাভাবিক হলেও জামায়াতের কোন আমীর এখন পর্যন্ত একাধিক আসনে প্রার্থী হননি। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে যেই আসনে ডা. শফিকুর রহমান সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন, তা ঢাকা-১৮ আসন। বিগত ফ্যাসিস্ট সময়ে এবং ফ্যাসিস্ট পরবর্তী সময়েও আমীরে জামায়াত নিয়মিত উত্তরায় ইতিকাফ, ঈদ উদযাপন উপলক্ষ্যে জনসাধারণের দোড়গোড়ায় গিয়েছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের জানাজায় উপস্থিত থেকেছেন আওয়ামী বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করেই। ৫ আগস্ট পরবর্তীতে নিয়মিত জুমার নামাজের আগে-পরে গণসংযোগ করেছেন ঢাকা-১৮ আসনে এবং দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতে জুমার নামাজ ছাড়াও সপ্তাহে অন্তত একদিন তিনি উত্তরা সফরে আসেন। দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ এই আসনে জামায়াত-শিবিরের দলীয় প্রভাব এবং ডা. শফিকুর রহমানের ব্যাপক ইমেজ ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন নি বর্তমান মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ আশরাফুল হক। এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মিডিয়া বিভাগের সাথে বর্তমান প্রার্থীর বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে হতাশার সুর শোনা যায়।
অন্য একটি সূত্র মতে, শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচনের অনুমতি দেয়া হলে ঢাকা-১৮ থেকে মনোনয়ন দেয়া হতে পারে বর্তমান শিবির সভাপতি জাহিদুর রহমান বা ভিপি সাদিক কায়েমকে। জাহিদুর রহমান ডিসেম্বরেই তার মেয়াদ শেষের পর জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন। সে ক্ষেত্রে এমপি ইলেকশানে সবার শুরুতে তাকেই চাইবে জামায়াত এবং ছাত্রদের জন্য একটি আসন বরাদ্দ হলে তা হবে উত্তরা। কারণ জুলাই গণ অভ্যুথানে উত্তরায় শতাধিক শহীদের মাঝে শহীদ পারভেজ, মাওলানা জসীমউদ্দিন, নূর, আব্দুল্লাহ আত তাহির ছিলেন জামায়াত-শিবিরের সরাসরি জনশক্তি। মারাত্মক আহত হন মহানগর উত্তর শিবিরের নেতা তাহমিদ হুজায়ফা, রাহাতসহ আরো অনেকে। উত্তরার রাজনীতি অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ করে শিবিরের বর্তমান ও সাবেক নেতারা। এমতাবস্থায় প্রেস্টিজিয়াস এই আসন কোনভাবেই তারা হাতছাড়া করতে চাইবে না নিশ্চয়ই। শিবিরের প্রার্থীতা বিষয়ে কেন্দ্রীয় মিডিয়া বিষয়ক সম্পাদক আজিজুর রহমান আযাদের (যিনি নিজেও এ আসনের স্থায়ী বাসিন্দা) সাথে যোগাযোগ করা হলে, উনি চমকের জন্য আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে বলেন সবাইকে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারি ঢাকা-১৮ থেকে ইতোমধ্যে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এনসিপি থেকে তার মনোনয়ন একপ্রকার নিশ্চিত। সব সমীকরণ মিলিয়ে এটাই মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে উত্তরা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান বা দ্বিতীয় প্রধান নেতৃবৃন্দই শেষমেষ নির্বাচনে লড়বেন ও এমপি হবেন। তবে তারেক জিয়া বা ডা. শফিকুর রহমান কেউ কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা আগেভাগেই না দিয়ে সজাগ চোখ রেখেছেন দুই দলের মনোনয়নের উপর।