বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে শেখ হাসিনা এক নাটকীয় চরিত্র। প্রায় ৪৫ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি, বিরোধী দলীয় নেতা এবং টানা দেড় দশক ধরে বিশ্বের দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা নারী প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে বসেই তাকে দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার খবর শুনতে হয়, এবং মানবতাবিরোধী অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডও পেয়েছেন তিনি। তার রাজনৈতিক জীবন যেন ক্ষমতায় ওঠা, পতন ও প্রত্যাবর্তনের নাটকীয়তায় ভরপুর।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর কোণঠাসা আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিতে ১৯৮১ সালে তিনি দেশে ফেরেন এবং দলের হাল ধরেন।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও বিরোধীদলীয় নেত্রী

বঙ্গবন্ধুর কন্যা হওয়ার কারণে দলের মধ্যে তার সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ছিল। এরশাদ সরকারের আমলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা তাকে দলের বাইরেও গ্রহণযোগ্যতা এনে দেয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি দেশের প্রথম বিরোধীদলীয় নারী নেত্রী হন। ১৯৯৬ সালের জুনে আয়োজিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০০১ সালে সংঘাতহীনভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ইতিহাস গড়েন। ২০০৪ সালে বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালে তিনি গ্রেনেড হামলার শিকার হন।

টানা সাড়ে ১৬ বছরের ক্ষমতা ও পতন

২০০৮ সালের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন এবং টানা সাড়ে ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকেন। তার শাসনকালে পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেলের মতো বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, যার জন্য তিনি প্রশংসা পেয়েছেন। তবে সমালোচকদের মতে, এই সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালে 'নিশিরাতের' ভোটের অভিযোগ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের ডামি প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে তিনি দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

এছাড়াও বিডিআর বিদ্রোহ (২০০৯), হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন দমন (২০১৩), ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন দমন (২০১৮) এবং সর্বশেষ কোটা সংস্কার আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি চালানোর মাধ্যমে বিরোধ মত ও আন্দোলনের ওপর দমন-পীড়নের অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। সরকারি হিসাবে কোটা আন্দোলনে নিহত ৮৪৪ জন হলেও জাতিসংঘ জানায়, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে এক হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারান। সহিংসতার মুখে ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ

বিশ্লেষকদের মতে, মৃত্যুদণ্ডের রায় পাওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনার রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ আছে কি না, তা নির্ভর করবে সামনের দিনগুলোতে নতুন সরকার কেমন কাজ করে। মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, যদি আগামীর নেতৃত্ব হাসিনার চেয়ে খারাপ কাজ করে বা একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, তবে তার কামব্যাক করার একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে

ইএফ/