বহুল আলোচিত ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন অভিযুক্তের রায় আজ সোমবার (১৭ নভেম্বর) ঘোষণা করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল সকাল ১১টায় এই রায় ঘোষণা করবেন। পুরো দেশের নজর এখন ট্রাইব্যুনালের দিকে।
এই রায় ঘোষণার ঠিক আগে, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে বলেন, "আদালত কী রায় দেবেন জানি না। তবে মৃত্যুদণ্ড তার অপরাধের তুলনায় কম শাস্তি।"
মোর্তোজার মন্তব্য ও মামলার প্রেক্ষাপট
মোর্তোজা তার পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, যদি তাকে (শেখ হাসিনা) বাকি জীবন জেলে আটকে রাখা যায়, তবেই তার অপরাধের কিছুটা শাস্তি নিশ্চিত করা যাবে। তিনি আরও লেখেন, "অবশ্য মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বাকি জীবন পলাতক থাকাও কম শাস্তি নয়।" মানবতাবিরোধী অপরাধে গুম-খুনের মাস্টারমাইন্ডের দ্রুত বিচার প্রত্যক্ষ করাও কম প্রাপ্তি নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া, যারা এই বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলে পলাতক মাস্টারমাইন্ডের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করছেন, তাদের করুণা না ঘৃণা করা হবে—সেই সিদ্ধান্ত দেশের মানুষের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন এই সাংবাদিক।
মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
পাঁচটি মূল অভিযোগ
রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে জুলাই আন্দোলনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচারে গণহত্যার মতো অপরাধের সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা প্রধান অভিযোগগুলো হলো:
১. উসকানিমূলক বক্তব্য ও গণহত্যা: গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনে আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ উল্লেখ করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। এর ফলশ্রুতিতে আসাদুজ্জামান খান ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ অন্যদের প্ররোচনা ও সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসীরা প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করে ও ২৫ হাজার জনকে আহত করে।
২. মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ: শেখ হাসিনা হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ দেন, যা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির মাধ্যমে কার্যকর হয়। তার কথোপকথনের পৃথক অডিও রেকর্ড থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এর দায়ে তাদের ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ বা সর্বোচ্চ দায়ের আওতায় অভিযুক্ত করা হয়।
৩. আবু সাঈদ হত্যা: রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা।
৪. চাঁনখারপুলে হত্যাকাণ্ড: রাজধানীর চাঁনখারপুলে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা।
৫. আশুলিয়ায় অগ্নিসংযোগ ও হত্যা: আশুলিয়ায় নিরীহ-নিরস্ত্র ছয়জনকে হত্যার উদ্দেশ্যে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা।
মামলায় ৫৪ জন সাক্ষী দিয়েছেন এবং শেখ হাসিনার কথোপকথনের অডিও–ভিডিও, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন, জব্দ করা গুলিসহ নানা আলামত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অভিযুক্ত সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হিসেবে অপরাধ স্বীকার করে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ইএফ/