মানবসভ্যতার বিকাশে আগুনের আবিষ্কারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে ধরা হয়। খাদ্য রান্না, শীত থেকে সুরক্ষা, বন্যপ্রাণী তাড়ানো কিংবা সামাজিক জীবনের সূচনা—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে আগুনের ভূমিকা। এতদিন ধারণা ছিল, মানুষ প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে আগুন জ্বালানোর কৌশল আয়ত্ত করে। তবে সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা সেই ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে।

নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, আজ থেকে অন্তত চার লাখ বছর আগেই আদিম মানুষ আগুন জ্বালাতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিল। ব্রিটেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বার্নহাম এলাকায় খননকাজ চালিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এমন কিছু নিদর্শন পেয়েছেন, যা ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন জ্বালানোর স্পষ্ট প্রমাণ দেয়

লন্ডন থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার উত্তরে বার্নহাম গ্রামের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে পাওয়া গেছে পোড়া মাটির উনুন সদৃশ কাঠামো, তাপে ফেটে যাওয়া পাথরের অস্ত্র এবং পাইরাইট নামের খনিজের টুকরা। পাইরাইটে আঘাত করলে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়—যা আদিম মানুষের আগুন জ্বালানোর কৌশলের ইঙ্গিত দেয়।

এই নিদর্শনগুলো বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা নিশ্চিত হয়েছেন, এটি কোনো প্রাকৃতিক দাবানলের ফল নয়। বরং নির্দিষ্ট স্থানে বারবার আগুন জ্বালানো হয়েছিল, যা পরিকল্পিত মানবীয় কর্মকাণ্ডের দিকেই ইঙ্গিত করে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আধুনিক মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্স পৃথিবীতে আবির্ভূত হয় প্রায় তিন লাখ বছর আগে। অথচ বার্নহামের এই প্রমাণ চার লাখ বছরের পুরনো। অর্থাৎ, আধুনিক মানুষের আগেই ‘হোমো’ গণের অন্য কোনো প্রজাতি—সম্ভবত নিয়ান্ডার্থাল বা হোমো হাইডেলবার্জেনসিস—আগুন জ্বালানোর কৌশল রপ্ত করেছিল।

গবেষণাদলের প্রধান, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রত্নতত্ত্ববিদ নিক অ্যাশটন জানান, এটি শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বব্যাপী আগুন জ্বালানোর অন্যতম প্রাচীন প্রমাণ। তবে তিনি মনে করেন, বার্নহামই প্রথম স্থান—এমন দাবি করা কঠিন, কারণ আগুনের প্রমাণ সংরক্ষণ করা প্রকৃতিগতভাবেই জটিল।

এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ। গবেষকদের মতে, আগুন নিয়ন্ত্রণের এই দক্ষতা মানববিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে—যার মাধ্যমে খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক বন্ধন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

নতুন এই আবিষ্কার মানবসভ্যতার ইতিহাসে আগুনের যাত্রাকে আরও কয়েক লাখ বছর পেছনে নিয়ে গেল—যা আমাদের অতীত সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।